বুমেরাং

আসামে 'বহিরাগত' বনাম 'ভূমিপুত্র' সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী।তবু আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যের রাজনীতিতে 'বহিরাগত' তকমাটি এতকাল নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। মূলত বাঙালি মুসলমানদের দিকে 'মিয়াঁ' তির উঁচিয়ে যে মেরুকরণের তাসটি খেলা হতো,পশ্চিম কার্বি আংলঙের খেরোনি-কাণ্ডে সেই সমীকরণ রাতারাতি পাল্টে গেছে।এবার আর আসামের মুখ্যমন্ত্রীর প্রিয় লজ 'অচিনাকি' (অপরিচিত) শত্রু নয়, সরাসরি 'ভারতীয় বংশোদ্ভূত' হিন্দিভাষী এবং হিন্দু বাঙালিদের দিকেই ধেয়ে আসছে 'ভূমিপুত্র'দের উচ্ছেদ-হুঙ্কার। কার্বি আংলং জেলার খেরোনি নামের এই জনবসতি সেই অর্থে এতদিন মূল ধারার রাজনীতির নজরে অজ্ঞাত ও অশ্রুত জনবসতি ছিল। বিগত বছরের শেষ লগ্ন থেকে তারাই চলে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে।সেখানেই স্থিত সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত এলাকায় সংরক্ষিত তৃণভূমি প্রফেশনাল গ্রেজিং রিজার্ভ এবং ভিলেজ গ্রেজিং রিজার্ভ, যথাক্রমে পিজিআর এবং ভিজিআর। সেখানেই জবরদখলকে কেন্দ্র করে যে আগুনের ফুলকি আগে দৃশ্যমান হয়েছিল ক্রমে তা দাবানলের আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্ট দুই তৃণভূমিই আদতে সংরক্ষিত তৃণভূমি যেখানে গরু, ছাগল, মোষ ও অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণী বিনা বাধায় চরতে পারে, কিন্তু পাহাড়ি কিংবা সমতলবাসী কেউ সেখানে ঘরবাড়ি তৈরি করতে পারেন না। সংবিধান ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় সংরক্ষিত দুই তৃণভূমিতে বসবাসরত আদিবাসীদের স্থানীয় স্তরে স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি যে সব রক্ষাকবচ রয়েছে, যেখানে আঘাত এলে প্রত্যাঘাত অনিবার্য।বস্তুত সেটাই হয়েছে। এই সংঘাতের মূলে রয়েছে ভূমির অধিকার। কার্বি সংগঠনগুলির অভিযোগ, বিহারি জনজাতির একাংশ সংরক্ষিত এলাকায় স্থায়ী ইমারত বানিয়ে বসে আছেন। বিপরীত দিকে, 'রচনাত্মক নোনিয়া সংযুক্ত সঙ্ঘ'-এর মতো সংগঠন যখন রাষ্ট্রপতির কাছে সেই জমিতে স্বত্বাধিকারের দাবি জানায়, তখন কার্বিদের মনে নিজভূমে পরবাসী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। আদালতের স্থগিতাদেশে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় ক্ষোভের পারদ আরও চড়েছে। যার করুণ পরিণতি- খেরোনিতে অগ্নিকাণ্ডে এক বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তির জতুগৃহে মৃত্যু এবং পুলিশের গুলীতে বিক্ষোভকারীর প্রাণহানি। সৌরভ দাসের জীবন্ত পুড়ে মারা যাওয়া কোনও 'দুর্ঘটনা' নয়, এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নগ্ন প্রমাণ।অতএব প্রশ্নটি কেবল এক টুকরো চারণভূমির নয়, প্রশ্নটি পরিচয়ের রাজনীতির। এত দিন যা ছিল ধর্মীয় বিভাজন, এখন তা স্পষ্টতই 'আদি বাসিন্দা' বনাম 'ভারতীয় বংশোদ্ভূত' দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত হয়েছে। যে শাসক উত্তর ও পশ্চিম ভারতের আর্যাবর্তের হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করে পূর্বোত্তরে জমি শক্ত করতে চেয়েছিল, আজ সেই আদর্শই জনজাতীয় আবেগের ধাক্কায় কোণঠাসা। কার্বি ও তিওয়া সংগঠনগুলির অভিযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট শাসকের প্রশ্রয় পেয়েই বহিরাগত তাদের সংরক্ষিত এলাকায় স্পর্ধা দেখাচ্ছে। অর্থাৎ, যে বুলডোজার সংস্কৃতি এত কাল একতরফা চলেছিল, এখন তার অভিমুখ বদলে যাওয়ায় শাসক শিবিরের অস্বস্তি চরমে। পরিসংখ্যান বলছে, কার্বি আংলং বা ডিমা হাছাও জেলায় ঘনঘনত্ব রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তের তুলনায় অনেক কম। সেখানে জমির আকাল হওয়ার কথা নয়। তবুও কেন এই মরণপণ লড়াই? উত্তরটি হয়তো নিহিত রয়েছে গভীর অবিশ্বাসে। একদিকে কর্পোরেট সর্দারদের হাতে জমি তুলে দেওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে আর্যাবর্তের।'জয় শ্রীরাম' সংস্কৃতির আগ্রাসন; এই দ্বিবিধ চাপে পড়ে জনজাতীয় সমাজ আজ অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া। জুবিন গর্গের রহস্যমৃত্যু বা মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ সেই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে।এতদিন আসামের জাতি-বিদ্বেষের সুবিধাজনক শত্রু ছিল 'মিয়াঁ'। তাদের গায়ে 'বাংলাদেশি' তকমা লাগিয়ে বুলডোজার চালানো সহজ ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ নির্বিকার থেকেছে, প্রশাসন উল্লসিত হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষিত তৃণভূমিতে বসবাসকারী 'অবৈধ' রা মুসলমান নন, তারা বিহারি, 'জয় শ্রীরাম' বলা মানুষ। আসামের রাজনৈতিক সমীকরণ কি তবে এক নতুন বাঁকের মুখে? দীর্ঘ বছর ধরে বাঙালি হিন্দু ও হিন্দিভাষীরা ছিলেন বিজেপির অটল ভোটব্যাঙ্ক। আজ তারাই যদি 'আদি বাসিন্দা'দের চোখে বিষবৎ হয়ে ওঠেন,তবে সেই ক্ষত নিরাময় করা কঠিন হবে।'তোমাকে বধিবে যে, 'গোকুলে বাড়িছে সে'-প্রবাদটি বোধহয় আসামের বর্তমান শাসকের জন্য আজ চরম বাস্তব। যে আবেগকে উসকে দিয়ে ক্ষমতার অলিন্দের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল, সেই আবেগের বুমেরাং এখন ঘর সামালাতেই ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে। খেরোনির আগুন নিভলেও, অবিশ্বাসের যে ধোঁয়া আসামের আকাশে উড়ছে, তা অশনি সংকেত। ইতিহাসের এ এক সত্যিই অমোঘ পরিহাস, যে হিন্দুত্বের আবেগকে পুষ্ট করে আজকের শাসনক্ষমতা সুদৃঢ় হয়েছে, সেই শক্তিই আজ প্রান্তিক আসামে 'অপর' হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ইঙ্গিত দিচ্ছে বুমেরাংয়ের।
Dainik Digital: