দ্বিতীয়বার মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়েই, ধীরে ধীরে নিজের দ্বিতীয়বার আসল চেহারাটা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।আন্তর্জাতিক মহলের একটা অংশের মতে প্রথমবার মার্কিন রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হয়ে ট্রাম্প অনেকটা মুখোশ পড়ে ছিলেন। দ্বিতীয়বার মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদে বসেই সেই মুখোশ খুলে স্বমহিমায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এখন যত দিন গড়াচ্ছে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্পের এই ভূমিকায় নতুন করে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা উদ্বেগ ও যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যতদিন এগুচ্ছে আশঙ্কা আরও বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নতুন হুমকি আসছে। ট্রাম্পের এই হুমকিকে কেন্দ্র করে পাল্টা হুঁশিয়ারিও চলছে মার্কিন বিরোধী শক্তিগুলির। সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা অস্থির পরিস্থিতি কায়েম হয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, যে কোনও সময় যুদ্ধ বাধার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আমেরিকার এই আগ্রাসন নীতি নতুন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? আন্তর্জাতিক মহলের দাবি, মূল সমস্যা হচ্ছে ডলারে। মার্কিন মুদ্রায় ব্যবসা করতে না চাইলেই ঢিল পড়ে যায় মৌচাকে। বেপরোয়া হয়ে উঠে মার্কিন প্রশাসন। কালে কালে আমেরিকার সেই রোষেই বলি হতে হয়েছে সাদ্দাম হোসেন থেকে শুরু করে গাদ্দাফি পর্যন্ত। এই রোষে একেবারে শেষ সংযোজন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরা। মাদক পাচার, মাদক বিক্রির টাকায় আমেরিকায় সন্ত্রাসবাদ চালান করার অভিযোগে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে আচমকা তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন সেনারা। এমনটাই জিগির তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসন।কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি, আসল ঘটনা অন্যকিছু।এটি একটি পুরনো সংঘাতের ফল।ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে আচমকা তুলে নেওয়ার পেছনে, মার্কিন প্রশাসনের সেই আগ্রাসন নীতিই প্রধান কারণ বলে অভিমত। যখনই কোনও দেশ তাদের তেল বিক্রির জন্য মার্কিন ডলারের পরিবর্তে অন্য কোনও মুদ্রা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখনই আমেরিকা সেই দেশের ওপর নানা অজুহাতে আক্রমণ চালিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও অনেকে একই কারণ দেখছেন।অনেকের মতে, এই পরিস্থিতি শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে, যখন ভেনেজুয়েলা নিজেদের মার্কিন ডলারের নির্ভরতা থেকে মুক্ত ঘোষণা করে। এই ঘটনার পর ভেনেজুয়েলা চিনের কাছে ইউয়ান মুদ্রায় তেল বিক্রি শুরু করে। ভেনেজুয়েলার এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে নেয়নি। কারণ, এতে চিন একসময় বিশ্ব অর্থনীতিতে আমেরিকার আধিপত্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা মার্কিন প্রশাসনের। আজ থেকে প্রায় আড়াই দশক আগে ২০০০ সালে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনও মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। সেই সময় সারা বিশ্বে ইরাক থেকে তেল সরবরাহ হতো। এমনকী ভারতেও ইরাকি তেল আসত। খবরে প্রকাশ, সেই সময় সাদ্দাম হোসেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি তেলের দাম ডলারের পরিবর্তে ইউরোতে গ্রহণ করবেন। তার এই সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। পরিণাম গোটা বিশ্বের জানা।খবরে প্রকাশ, লিবিয়ার নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফিও চেয়েছিলেন পুরো আফ্রিকার জন্য একটি একক মুদ্রা চালু করতে। যার নাম হতো 'আফ্রিকান গোল্ড দিনার'। তারপরের পরিণতি সকলের জানা। ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিকস জোটে (ভারত, ব্রাজিল, চিন, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা) যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে এই জোটের নেতৃত্বে আছে ভারত। এই জোটের প্রধান তিন শক্তি ভারত, চিন, রাশিয়া নিয়মিতভাবে মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলছে। ব্রিকস দেশগুলো এখন নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যবসা করতে উৎসাহিত হচ্ছে। ভারত গত বছর থেকেই ব্রিকস দেশগুলোকে ভারতীয় টাকায় লেনদেন করার অনুমতি দিয়েছে। যাতে মার্কিন ডলারের উপর চাপ কমানো যায়। ইতিহাস বলছে, যখনই কোনও দেশ ডলার ছেড়ে সোনা বা অন্য মুদ্রায় ব্যবসা করতে চেয়েছে, তখনই তারা মার্কিন রোষানলে পড়েছে। তবে ভারত, চিন, রাশিয়া, যে ইরাক, লিবিয়া এবং ভেনেজুয়েলা নয়, সেটাও ভালো করে জানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ট্রাম্পের মুখে যতটা গর্জন শোনা যাচ্ছে, তা বর্ষণে রূপান্তরিত করতে হলে-তাকেও যে পাঁচবার ভাবতে হবে, এ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে ভারতকে সব দিকেই চোখ-কান খোলা রেখে চলতে হবে। নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্বজুড়ে যে যুদ্ধের উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছায়। সেটাই এখন দেখার।