গণতন্ত্রে বিরোধীরা বা বিরোধী দল শুধু মাত্র শাসকদলের প্রতিদ্ব-ন্দ্বী ই নয়, বরং সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। শুধু তাই নয়, বিরোধী দল গণতন্ত্রের প্রহরী হিসাবে কাজ করে। তাই একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধীদের এবং বিরোধী দলের ভূমিকা ও দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। কেন না, গণতন্ত্রে বিরোধীরা অথবা বিরোধী দল জনগণের কন্ঠস্বর হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ যাতে সুরক্ষিত থাকে, তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত প্রতিটি কার্যক্রমের উপর তীক্ষ্ণ নজরদারি করা। জনগণের স্বার্থ বিরোধী কোনও কাজ হলে, তা জোড়ালোভাবে উত্থাপন করে সরকারকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা এবং বিকল্প নীতির প্রস্তাব তুলে ধরা সহ আরও অনেক কিছুই বিরোধী দলের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই বিরোধী দলের ভূমিকা যতটা শক্তিশালী হবে, গণতন্ত্র ততটাই মজবুত হবে। সেজন্যই সমাজবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বরাবরই দাবি করেন যে, গণতন্ত্রে এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় শাসকের চাইতে বিরোধীদের দায়িত্ব অনেক বেশি।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিরোধীরা বা বিরোধী দল যদি দুর্বল হয়, তাহলে গণতন্ত্রও দুর্বল হবে। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ অসুরক্ষিত হয়ে পড়বে। বিরোধীদের অথবা বিরোধী দলের দুর্বলতাকে হাতিয়ার করে, শাসক তাদের ইচ্ছেমতো নীতি, সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে। শাসকের মধ্যে একনায়কতন্ত্রী এবং স্বৈরাচারী মনোভাব প্রকট হয়ে উঠবে। এজন্যই গণতন্ত্রে বিরোধীদের দায়িত্ব ও ভূমিকাকে শাসকের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হয়। এই গুরু দায়িত্ব পালন করতে হলে বিরোধী দল এবং বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটাও অত্যন্ত জরুরি। এ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। বিরোধী অনৈক্য গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।শাসককে বেপরোয়া হয়ে উঠতে সহায়তা করে। এখানেই শেষ নয়, বিরোধী নেতৃত্বের যোগ্যতা, জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতাও অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠে-গণতন্ত্রকে দুর্বল করার জন্য।
এই বিষয়গুলি বলার একটাই কারণ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের বর্তমান বিরোধীরা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে, বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। এর একটাই প্রধান কারণ 'বিরোধী অনৈক্য"। খুব বেশি পেছনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মোদি জমানায় গত বারো বছরে একটি ইস্যুতেও বিরোধীরা এককাট্টা হয়ে, শাসকদলের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। আরও স্পষ্ট করে বললে বিরোধীরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইস্যু নিয়েও বিরোধীরা গত বারো বছরে একমত হতে পারেনি। ইস্যু নির্ধারণ করা নিয়েও বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে। গত বারো বছরে এমন সব ইস্যুকে হাতিয়ার করা হয়েছিলো, যেগুলো নিয়ে হঠাৎ বাজার গরম হয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু কাজের কাজ আর কিছুই হয়নি। ওইসব 'ইস্যু' রাজনীতির ময়দানে হঠাৎ 'বাজার গরমের' তকমা পেয়ে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। রাজনৈতিক মহলের একটা অংশের দাবি, 'সারবর্তাহীন ইস্যু'। মোদ্দাকথা, সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেও, সেই অভিযোগ প্রমাণে এবং জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে বিরোধীরা। 'রাফেল' থেকে শুরু করে 'ভোট চুরি', কোনও ইস্যুতেই সরকারকে সেইভাবে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারেনি বিরোধীরা। হালে প্রাক্তন সেনা প্রধান এমএম নারাভানের অপ্রকাশিত বই নিয়ে বিতর্ক, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, সর্বশেষ লোকসভার স্পিকারের উপর অনাস্থা, সবকটি ইস্যুতেই বিরোধীদের অনৈক্য স্পষ্ট। এই অনৈক্য দেশের গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ভারসাম্যকে বারবার প্রশ্নের মধ্যে ফেলবেই। এ নিয়েও কোনও দ্বিমত নেই।