বাঙলার গণতান্ত্রিকতা

সম্পাদকীয়, ১৫ ফেব্রুয়ারীঃ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক ছাড়া কিছুই বদলাবে না-এই অমোঘ ও ক্রিটিক বাণী স্মরণ ও বরণ করেও আমাদের, গণতন্ত্রীদের বলতে হয়-নির্বাচন আমাদের চাই। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কোনও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক ও স্বায়ত্বশাসিত সংস্থার তত্বাবধানে। কারণ নির্বাচন হল গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার। এই দরজা বন্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতার পথ প্রশস্ত হয়। তাই হাজারো হতাশা, সীমাবদ্ধতার পরও আমাদের বলতে হয়, ‘আমাদের নির্বাচনই লাগবে।’ আবার জানা কথা হল- নির্বাচনের পর অনেকেই বলবেন, দেখলেন তো. কিছুই বদলায়নি। যে লঙ্কায় যায় সেই রাবন। এর পরেও আমরা চাই নির্বাচন থাকুক। সুষ্ঠু হোক, নিরপেক্ষ হোক নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও তাই চেয়েছিলেন। তারাও ধরে নিয়েছিলেন, নির্বাচিত সরকার উৎখাতের পর যে অনির্বাচিত তত্বাবধায়ক সরকার রয়েছে সেখানে আর যাই ই থাক গণতান্ত্রিকতার কোনও গ্যারান্টি নেই। তাই একটি নির্বাচিত সরকার আনলেন সেই দেশের মানুষ। ভোট শুধু সংসদের হয়নি। সেই সঙ্গে গনভোট হয়েছে। গণভোট মানে বাংলাদেশে যাকে জুলাই সনদ বলা হয়ে থাকে, সেটি হ্যা ভোটে জিতে গেছে। অর্থাৎ নতুন সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে গণভোটের শর্তগুলি সামনে রেখে। এই শর্তগুলি বিজয়ী দল বিএনপির নির্বাচনী ইস্তেহারে থাকুক বা না থাকুক এই বিষয়গুলি কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা থাকতে হবে।

গত দেড় বছরে সরকারবিহীন একটি অরাজক পরিস্থিতিতে বিবদমান পক্ষগুলোকে টেবিলে বসানোর জন্য এক ধরনের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকত তত্বাবধায়ক সরকার। এর পরেও কিন্তু সনদের সব বিষয়বস্তু সম্পর্কে সব দল একমত নয়। বিএনপিও। তারাও কোথাও কোথাও আপত্তি জানিয়ে রেখেছে। কিন্তু এবার নির্বাচিত সরকার নিজেই হবে একটি পক্ষ। ফলে সমঝোতার মাঝখানের জমিটি খোঁজা কষ্টকর হবে। সে ক্ষেত্রে সমঝোতা কীভাবে হবে, নাকি আদৌ হবে না-এটা একটা বড় প্রশ্ন ও ঝুঁকি আকারে রয়ে যাবে আগামী বাংলাদেশে।

সেই দিক থেকে বাংলাদেশে সদ্যসমাপ্ত সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট মিলে এক ভিন্ন গুরুত্ব তৈরি করেছিল। ভোটটা কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউকে ক্ষমতায় আনা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে লুপ্ত হয়ে যাওয়া গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত, নির্বাচনি ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার ও ভোটব্যবস্থা জিইয়ে রাখার ধারাবাহিকতা তৈরি করাটাও ছিল। বাংলাদেশের জন্মের পর বারবারই একটি অধ্যায় ফিরে এসেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে ট্র্যাজিক সেই অধ্যায় হলো ভোটাধিকারের মতো একটি মৌলিক অধিকারকে দুর্লভ বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। দেশটি আজ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো স্বীকৃত পথ বের করতে পারেনি। ফলে, যিনি বা যাঁরা ক্ষমতায় যান, তারা আইনকানুনের প্যাচ-ফাঁক দিয়ে ফন্দিফিকির করেন। ফলে তাদের নামাতে হয় টেনেহিঁচড়ে অথবা রাজপথ নাগরিকের রক্তে লাল হয়।

খালেদা জিয়া তার পাঁচ বছর শাসনকালে শেষে নির্বাচন করার জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। সেই নির্বাচনে জয়লাভকরে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। তিনি তার প্রধানমন্ত্রীত্বে তত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তুলে দেন। ২০১৪,২০১৮ এবং ২০২৪ সালের ভোট তার নেতৃত্বাধীন সরকারই পরিচালনা করে থাকে। নির্বাচন গুলিতে ধারাবাহিক কারচুপির ঘটনায় বাংলাদেশে লেখা বা বলা হতো. নির্বাচনই কি গণতন্ত্র? নির্বাচন সম্পর্কে কিছু মানুষের বীতশ্রদ্ধ মানসিকতা আর এক ধরনের ফ্যাসিজমকেই উৎসাহিত করতো। সেই হিসাবে এই বছরের ভোটে বাংলাদেশের নবপ্রজন্মের অনেকেই জীবনের প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেন বলা যায়। অন্তত ২০২৪ এর জুলাই আগস্টে সেই দেশে ইসলাম জোট বাদেও অন্যান্য দলগুলির যে সমবেত বয়ান তৈরি হয়েছিল তাতে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে শেখ হাসিনার জমানায় মানুষের ভোটাধিকার ছিল প্রহসন। হাসিনা সরকার উতখাতের পর সংস্কার কমিশন তৈরি এবং এর ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সামাজিক সমঝোতার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল- এই নির্বাচন তার একটি ধাপ। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তারেক রহমানের শপথের মাধ্যমে দ্বিতীয় ধাপে পথ চলা শুরু হবে। চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌছানো অনেকটা সময়সাপেক্ষ। হয়তো এই পথ চলায় আসবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের বিষয়। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে না হলেও আওয়ামি লিগের বাংলাদেশে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসাটাও হবে সময়ের দাবি। তবে সেই সময় কবে আসবে তার জন্য অপেক্ষা শুরু হবে এখন, একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরক্ষনেই।

Dainik Digital: