বাঁশের বুননে অস্তিত্বের সন্ধান,চাটাই ও মানুষের অদম্য লড়াই!!

অনলাইন প্রতিনিধি :-এখানে চাটাই শুধু একটি হস্তশিল্প নয়। মানেই ভাত।চাটাই মানেই বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। বিশালগড় ব্লকের অধীন মধ্য লক্ষ্মীবিল গ্রাম পঞ্চায়েতের নমঃ পাড়ায় ঢুকলেই সেই সত্যটা চোখে পড়ে যায়। উঠানে উঠানে বাঁশের গন্ধ, হাতের ছন্দে বোনা জীবনের গল্প।আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে এই পাড়ার ছবিটা ছিলো একেবারেই আলাদা।অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটত বহু পরিবারের। কাজ বলতে কিছুই ছিলো না। ঠিক সেই সময় গ্রামেরই প্রখ্যাত ব্যক্তি পথিশ চক্রবর্তীর হাত ধরে কয়েকজন মানুষ শুরু করেন চাটাই তৈরির কাজ। ছোট্ট সেই উদ্যোগই আজ কয়েকশ পরিবারের রুজি-রোজগারের একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছে।আজ নমঃ পাড়ার ঘরে ঘরে একই দৃশ্য। পরিবারের সবাই মিলে চাটাই তৈরি করে। পুরুষ-নারী তো বটেই, স্কুল ফেরত কিশোরীর হাতেও বাঁশ। বাঁশ-বেতের তৈরি এই বিশেষ হস্তশিল্প পণ্য দু'টি সাইজে তৈরি হয়। ছোট ১৬×১৬ ইঞ্চি, বড় ১৮০৮ ইঞ্চি।
 ঘরে ঘরে তৈরি চাটাই কিনে নেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁদেরই একজন খোকন নমঃ জানান, প্রতিটি চাটাই প্রায় ৮ টাকায় কিনে আগরতলায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে দিল্লী, মুম্বাইসহ দেশের নানা বড় শহরে তা পৌঁছে যায় আরও বেশি দামে। ফুলের তোড়া বিয়ের বাসরের ডেকোরেশন, নানান সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয় এই চাটাই। এমনকী মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরেও রপ্তানি হয় বলে দাবি তাঁর। খোকন নমঃর অধীনে যুক্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার। প্রতিদিন গড়ে ১৫০০-২০০০ পিস চাটাই কেনা হয়। রোদে শুকিয়ে, চারপাশ মসৃণ করে কেটে প্যাকেটজাত করা হয়। প্রতি প্যাকেটে ৮০০ থেকে ১০০০টি। শুধু তিনি নন, অন্য ব্যবসায়ীদের হাত ধরেও নমঃ পাড়া ছাড়িয়ে সিপাহীজলা জেলার বহু গ্রামেই গড়ে উঠেছে এই কুটির শিল্প। এই শিল্পের প্রাণ এক বিশেষ বাঁশ। স্থানীয় নাম 'বুম্বাশ'। নমঃ পাড়ায় পা রাখলেই বোঝা যায়, কতটা আশা নিয়ে মানুষ এই বাঁশ বোনে। বছর চল্লিশের বিকাশ নমঃ বাড়ির উঠানে বসে চাটাই বানাচ্ছেন।পাশে স্ত্রী পুটিরানী, আর নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ে মন্দিরা। তিনজনের হাতের ছন্দে বোনা হচ্ছে আগামী দিনের স্বপ্ন।এই বাড়ির প্রবীণা দিপালী নমঃর কণ্ঠে আক্ষেপ 'সরকারী সাহায্য চাই। বাড়িতে বসে কাজ করি।
এই কাজটা আরও উন্নত করতে পারলে আয় বাড়বে, সংসার একটু ভালো চলবে।' দুই বাড়ি এগোতেই হৃদয় ভারী করে দেওয়া আরেক ছবি।৭০ বছরের গোপাল নমঃ আর ৫২ বছরের দিপালী নমঃ। নিঃসন্তান,ভূমিহীন দম্পতি। ঘরের দাওয়ায় বসে দুজনে চাটাই বানাচ্ছেন। ৩৫ বছর আগে বিয়ে। একসময় উত্তর চড়িলামে বাড়ি ছিলো। বাবার মৃত্যুর পর নমঃ পাড়ায় এসে খোকন নমঃর দেওয়া সামান্য জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই। আগে ধারি-টুকরি বানিয়ে চলত সংসার। পরে শুরু চাটাই। দিনে ২০-২২টির বেশি বানাতে পারেন না। বাঁশের দাম মিটিয়ে মাসে আয় মাত্র ২০০০-২৫০০ টাকা। এরমধ্যেই নেমে আসে আরও বড় আঘাত। গলায় ক্যান্সার। এক মাস আগরতলার ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসা হয় চাঁদা তুলে। দুই মাস আগে বাড়ি ফিরেছেন। এতদিন কোনো ভাতা ছিলো না। হাসপাতালের এক সহৃদয় চিকিৎসকের লেখা দরখাস্ত ব্লকে জমা দেওয়ার পর অবশেষে এই মাস থেকে চালু হয়েছে ৩০০০ টাকা বার্ধক্য ভাতা।নমঃ পাড়ার মানুষের দাবি একটাই- সরকার বাঁশ উৎপাদনে এগিয়ে আসুক। রাবার চাষ বাড়ায় আজ বাঁশের সংকট চরমে। অথচ এই চাটাই শিল্প সম্ভাবনাময়। বহু মানুষের কর্মসংস্থানের একমাত্র ভরসা। বাঁশের বুননে যে জীবন জড়িয়ে আছে তাকে বাঁচাতে একটু সহানুভূতি আর পরিকল্পনাই পারে বদলে দিতে শত মানুষের ভবিষ্যৎ।
Dainik Digital: