আরাববল্লি পর্বতমালায় খনন বন্ধ করে এবং মাত্র এক মাস আগে দেওয়া নিজেরই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্ট যে সিদ্ধান্ত নিল, তা নিঃসন্দেহে স্বস্তির।পরিবেশবিদ ও পরিবেশকর্মীদের চাপও ছিল সমান্তরালভাবে প্রবল। তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন- আরাবল্লি ধ্বংস হলে থর মরুভূমির বিস্তার রাজস্থান ও হরিয়ানাকে গ্রাস করতে পারে, এমনকি তার প্রভাব এসে পড়তে পারে রাজধানী দিল্লীর দোরগোড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে সেই বিপর্যয় বয়ে আনতে পারত ভয়াবহ বালিঝড় ও পরিবেশগত বিপদ। সেই বাস্তব বিপর্যয় যদি ঘটত, তার দায় এড়ানোর সুযোগ থাকত না দেশের সর্বোচ্চ আদালতেরও। কিন্তু এই স্বস্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন- যদি দেশজুড়ে প্রবল প্রতিবাদ, পরিবেশগত সর্বনাশের আশঙ্কা এবং জনমতের চাপ না থাকত, তাহলে কি শীর্ষ আদালত নিজের ভুল সংশোধনে এগোত?
আরাবল্লি সংক্রান্ত আগের রায় কার্যকর হলে কার্যত পাহাড়ের সংজ্ঞাই মুছে যেত। তার ফল কী হত, তা পরিবেশবিদরা বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন। খননের নামে পাহাড় কেটে থর মরুভূমির বিস্তার রোখার শেষ প্রাকৃতিক দেয়াল ভেঙে দেওয়া হত। রাজস্থান, হরিয়ানা হয়ে সেই বিপর্যয়ের অভিঘাত এসে পড়ত রাজধানী দিল্লীর বুকে। সেই ধ্বংসের দায় কি শুধু খনি মালিকদের ঘাড়ে চাপানো যেত? নাকি ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হত বিচার ব্যবস্থাকেও?এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হয়েই সুপ্রিম কোর্ট বাধ্য হয়েছে নিজের অবস্থান বদলাতে। অথচ বিচার ব্যবস্থা আদর্শভাবে এমন হওয়া উচিত নয়, যেখানে ভুল শুধরাতে মানুষের রাস্তায় নামার প্রয়োজন পড়ে। আদালতের কাজ জনমতের পেছনে ছোটা নয়, বরং সংবিধান ও যুক্তির আলোয় আগাম বিপদ চিনে নেওয়া।আরাবল্লি ইস্যুতে প্রতিবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে রাজনৈতিক রংহীন ছিল। কোনও দল নয়, সাধারণ মানুষই বুঝে গিয়েছিল- এই রায় কার্যকর হলে অস্তিত্বের সংকট অনিবার্য। সেই গণচাপ উপেক্ষা করা আদালতের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কিন্তু এই বাস্তবতা একই সঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- বিচার ব্যবস্থা কতটা বিছিন্ন হয়ে পড়ছে বাস্তব জীবন থেকে। ভারতের আইনি ব্যবস্থায় নৈর্ব্যক্তিক, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ বিচারের আর্দশ লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই আদর্শ সবসময় রক্ষিত হয়-এমন দাবি করা কঠিন। বহু ক্ষেত্রেই বিচার ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে জনতার আদালতের কাঠগড়ায়। আরাবল্লি সংক্রান্ত ২০ নভেম্বরের রায়, উন্নাওয়ের গণধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক কুলদীপ সিং সেঙ্গরের সাজা স্থগিত ও জামিন মঞ্জুর-এমন উদাহরণ জনমনে গভীর প্রশ্ন তুলেছিল।এই বিচ্ছিন্নতার উদাহরণ একটির বেশি। উন্নাওয়ের গণধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক কুলদীপ সিং সেঙ্গরের সাজা স্থগিত ও জামিন মঞ্জুরের রায় জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল, তা বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থায় গভীর ফাটল ধরিয়েছিল। সেইরায় খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত সংশোধনের পথে হাঁটলেও প্রশ্ন থেকে যায়- এমন রায় আদৌ কীভাবে দেওয়া হল?পশ্চিমবঙ্গের এক বিডিও অপহরণ ও খুনের মতো গুরুতর অভিযোগে নিম্ন আদালত থেকে জামিন পেয়ে যাওয়া ঘটনাও সেই একই সংকটের প্রতিফলন। কলকাতা হাইকোর্ট সেই জামিন খারিজ করে নিম্ন আদালতের নির্দেশে আইন লঙ্ঘনের যে দিকগুলি তুলে ধরেছে, তা শুধু একটি মামলার সমালোচনা নয়- তা গোটা বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ওপর তীব্র আঘাত।এই সব ঘটনায় আদালতের প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ নতুন করে উসকে ওঠে। ক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক পদ- এসব কি বিচারের মাণদন্ডে অঘোষিত ছাড়পত্র হয়ে উঠছে? যদি তাই হয়, তবে সেই রায়কে আদৌ 'বিচার' বলা যায় কিনা, সেই প্রশ্ন তোলাই নাগরিকের অধিকার।আরাবল্লি ইস্যুতে মানুষের প্রতিবাদ সুপ্রিম কোর্টকে রায় পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে। এটা একদিকে আশার, অন্যদিকে লজ্জার। আশা এই কারণে যে শেষ পর্যন্ত ভুল সংশোধনের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়। 'লজ্জা এই কারণে যে সেই দরজা খুলতে জনরোষের ধাক্কা দরকার হল।
সব প্রতিবাদ আইনে বিচার্য হতে পারে না- এ কথা ঠিক। কিন্তু প্রতিবাদের যুক্তি, তথ্য ও সর্বনাশের আশঙ্কা যদি স্পষ্ট হয়, তাহলে আদালতের উচিত তা উপেক্ষা না করা। আরাবল্লি ও উন্নাও-এই দুই ক্ষেত্রেই শীর্ষ আদালত শেষ পর্যন্ত সেই মানদণ্ডে ফিরেছে। প্রশ্ন একটাই- এই সংবেদনশীলতা কি নিয়ম হয়ে উঠবে, না কি ব্যক্তিক্রম হিসেবেই থেকে যাবে?শেষপর্যন্ত আরাবল্লি নিয়ে এই অবস্থান স্থায়ী হবে কিনা, তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই- এই মূহূর্তে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান মানুষের আস্থা ফেরানোর লড়াইয়ে এক প্রয়োজনীয়, যদিও বিলম্বিত, পদক্ষেপ। বিচার যদি সত্যিই ন্যায়বিচার হয়, তবে তাকে প্রতিবাদের ভয়ে নয়, দায়িত্বের তাগিদেই নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখতে হবে।