রাস্তা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, সেতু প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, আগুন প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, জল প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, দূষণ প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, উদাসীনতা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।সমাজে কি এখন দায়বদ্ধতার বড়ই অভাব? পরিকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু দায়বদ্ধতা কই!কেউ কোনো দায়িত্ব নিতে চায় না। প্রাণ যায় যাক, সম্পত্তিহানি হয় হোক, বিপর্যয় হয় হোক কারোর যেন কোনো হেলদোল নেই। অতি সম্প্রতি ইন্দোরে জল দূষণে মৃত্যু হয়েছে বহুজনের। অথচ রাজ্যের এক মন্ত্রীকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করাতে তিনি চটে যান। এখন চারিদিকে এটাই হচ্ছে। কাউকে কিছু বলা যাবে না, কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। মানুষের প্রাণ যায় যাক এটাই যেন ভবিতব্য।
গত চারদিন আগে দিল্লী লাগোয়া উত্তরপ্রদেশের শিল্পতালুক নয়ডায় গভীর রাতে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় এক সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনীয়ারের মৃত্যু ঘিরে এখন চর্চা চলছে উত্তরপ্রদেশ জুড়ে, দিল্লী জুড়ে। কেননা এই কাণ্ডে এমন এক নাম জড়িয়েছে যা দিল্লীর অলিন্দকে একেবারে নাড়িয়ে দিচ্ছে। সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনীয়ার যুবরাজ মেহেতা গভীর রাতে তার গাড়ি নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে কর্মস্থল গুরুগ্রাম থেকে নয়ডার বাড়িতে ফিরছিলেন। নয়ডায় রাস্তায় কোনো রিফ্লেক্টর ছিল না বা ব্যারিকেডও ছিল না। ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতাও ছিল না। যুবরাজের এসইউভি ডিভাইডারের ধাক্কা মেরে পাশের সত্তর ফুট গভীর একটি জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার সময় রাস্তায় পুলিশ, দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী থাকলেও তারা তাকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছে।চারদিন পর তার গাড়ি উদ্ধার করা যায়নি আজও। দুর্ঘটনার পর রাস্তার নির্মাণ সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলো নয়ডা পুলিশ। এর জেরে নির্মাণ সংস্থার এক পদস্থ কর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে নয়ডা সংস্থার সিইও-কে। এর সাথে জড়িয়ে গেছে এক নাম। তিনি আইএএস অফিসার মেধা রূপম। সম্পর্কে তিনি দেশে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা। তিনি নয়ডা কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদাধিকারী। তাকে কেন তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার চারদিন পর তিনি দুর্ঘটনাস্থলে এলেও বিলাসবহুল গাড়ি থেকে তিনি নামেননি। গাড়িতে বসেই সাংবাদিকদের জবাব তিনি দিয়েছেন।
যুবরাজের মৃত্যু অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাস্তাঘাটে এভাবে যে কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এর দায় কে নেবে?এর জবাব কে দেবে? আর কত প্রাণ দেবে মানুষ। কেউ মরবে বিষাক্ত জল খেয়ে,কেউ মরবে বন্যায়, কেউ মরবে আগুনে, কেউ মরবে বিমান দুর্ঘটনায়।কিন্তু দায়ভার কারোর না কারোর তো রয়েছে।কিন্তু কেউ তো দায় নিচ্ছে না! চাপের মুখে অনেক সময় তদন্ত হলে কিছুদিন পর তা থিতিয়ে আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে নগর ব্যবস্থা,সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি যে ভেঙে পড়ছে এর কারণ অর্থ প্রযুক্তি বা সমাধানের অভাব নয়, অভাব হচ্ছে দায়বদ্ধতার। দেখা যাচ্ছে সংসদ ভবনের নির্মাণ হচ্ছে। কিছুদিন পর ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ছে, কিন্তু দায় কেউ নিচ্ছে না। বিমানবন্দরের নির্মাণ হচ্ছে, ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ছে। দায়ভার কারোর নেই।ত্রিপুরার অবস্থাই যদি ধরা হয় - জাতীয় সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এর জন্য। অর্থাৎ অর্থের কোনো অভাব নেই। সরকার চাইছে পরিকাঠামোর উন্নয়ন হোক। মানুষ এর সুবিধা পাক। কিন্তু মানুষ কি আদৌ এর সুবিধা পাচ্ছে? জাতীয় সড়কের হাল ক্রমশ বেহাল। মানুষ একবার জাতীয় সড়ক দিয়ে গেলে দ্বিতীয়বার আবার যাবার নাম নেয় না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে জাতীয় সড়কের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। কিন্তু সড়ক নির্মাণে এত দুর্নীতি হচ্ছে যে কয়েক মাস পরই জাতীয় সড়ক ভেঙে যাচ্ছে। বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। গাড়িঘোড়ার দুর্ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এর জন্য দায়ী কে দায়বদ্ধতা কার? কেউ দায়বদ্ধ হতে চাইছেন না। এ জন্যই প্রাণ গেলেও কারোর কোনো হেলদোল নেই। এই ব্যবস্থা কি চলতেই থাকবে? নয়ডার দুর্ঘটনা সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ মাত্র।