দৈনিক সংবাদ অনলাইন:-কাকড়াবনের ঐতিহ্যবাহী মাছের বাজার আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। যে বাজার একসময় এক টাটকা দেশি মাছের প্রাচুর্যে ভরপুর থাকত, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে ৯. তীব্র সংকট ও দামবৃদ্ধির করাল ছাপ। শিং, মাগুর, কৈ, পুঁটি, শোল, ৫. টাকি, চিতল-এইসব জনপ্রিয় দেশি মাছ এখন বাজারে প্রায় নামমাত্র, আর যা পাওয়া যাচ্ছে তার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক বাইরে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শিং ও মাগুর মাছ কেজিপ্রতি ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, কৈ মাছ ৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা, টাকি মাছ ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং পুঁটি মাছও ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার নিচে নেই। ফলে খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবার-সবাই পড়েছেন এ চরম বিপাকে। অনেকেই মাছের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন।
মাছ বিক্রেতাদের মতে, এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় জলাশয়গুলির অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। নদী, খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়া, জলস্তর কমে যাওয়া, আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং মাছের স্বাভাবিক প্রজননে বাধা-সব মিলিয়েই কমে গেছে দেশি মাছের জোগান। তার ওপর মাছ ধরার খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকছে না।
এক বিক্রেতার কথায়,”আগে আশেপাশের পুকুর, বিল, নদী থেকেই মাছ আসত। এখন সেগুলোতে মাছ নেই বললেই চলে। বাইরে থেকে আনতে গেলে খরচ অনেক বেশি-তাই দামও বেশি রাখতে হচ্ছে।”
অন্যদিকে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভবাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সঙ্গে মাছের দাম বাড়ায় সংসারের বাজেট ভেঙে পড়ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে চাষের মাছ বা তুলনামূলক কম দামের মাছের দিকে ঝুঁকছেন।
এক গৃহবধূ বলেন,“লোকাল মাছ পুষ্টিকর বলে সবসময় কিনতাম। কিন্তু এখন এই দামে কেনা সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে অন্য মাছ কিনতে হচ্ছে।”
তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমদানি হওয়া মাছ এখন কাকড়াবনের বাজারে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন চাষের মাছের জোগান থাকায় সাধারণ মানুষ অন্তত সম্পূর্ণভাবে মাছ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না। এই আমদানি মাছই বর্তমানে বাজারের ভারসাম্য কিছুটা ধরে রেখেছে।
সচেতন মহলের মতে, সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। দীর্ঘদিন ধরে জলাশয়ের সংস্কার না হওয়া, অবৈধ ও নির্বিচারে মাছ ধরা, মাছের পোনা সংরক্ষণের অভাব এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি-এসব কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি।
তাঁদের দাবি, অবিলম্বে জলাশয় পুনর্গঠন, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ মাছ ধরার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা এবং মৎস্য দপ্তরের সক্রিয় হস্তক্ষেপ জরুরি।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কাকড়াবনের বাজার থেকে একসময় দেশি মাছ পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। তখন এই ঐতিহ্য শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বর্তমানে বাংলা থেকে আসা মাছই সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা-তবে সেটিও কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।