নতুন পথের যাত্রা

দেশে বেকারত্বের হাল ফেরে নি,কমেনি মুদ্রাস্ফীতি।এর পরেও বার্ষিক বাজেট পেশের দুই দিন আগে অর্থমন্ত্রকের আভাস, শ্রম মন্ত্রকের রিপোর্ট মিলিয়ে অর্থমন্ত্রীর যে সমীক্ষা রিপোর্ট তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশের আর্থিক অবস্থা নিয়ে এবং প্রবৃদ্ধির গতি প্রকৃতি নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই সময়ে, বছরের শুরুতে এইটি পণ্ডিত, বিশ্লেষকদের জন্য এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়,তাতে সন্দেহ নেই।
প্রতিবছরেই বাৎসরিক বাজেট পেশের আগে সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকেন অর্থমন্ত্রী। দেশবাসী আজকাল এই রিপোর্ট মনে রাখতে চান না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সেই সব রিপোর্টের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।সাধারণ দেশবাসী খুঁজেন কর্মসংস্থান,মুদ্রাস্ফীতি-পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ঝোঁক হবে নিম্নগামী। কার্যক্ষেত্রে তা হয় না। ফলে এই সব সমীক্ষা এক সাধারণ প্রশাসনিক উপাচার হয়ে গেছে। এই সব সমীক্ষা রিপোর্ট নিয়ে সংসদের অধিবেশন চলাকালে ঝড়ঝঞ্জা হবে। এর পর সব থেমে যাবে- কিন্তু থামবে না কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাসের লেখচিত্র আর মূল্যবৃদ্ধির উর্ধ্বরেখা।প্রধানমন্ত্রী মোদির সাংবাদিক সম্মেলনের পর অর্থনীতি, ভূ রাজনীতির লোকজনেরা তার বক্তব্যের কাটাছেড়া শুরু করেছেন।শুরু হয়েছে নানান দিক থেকে তার বিশ্লেষণ।প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশ আজ আশার আলো দেখছে। সংসদ ভবনে চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথায় প্রধানমন্ত্রী আলোকপাত করেছেন ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্যের চুক্তির ওপর। তার কথায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকেই দেখা যাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুফল। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, এই চুক্তিই হল 'মাদার অফ ডিল।' অর্থাৎ এই জাদুকাঠির ছোঁয়াতেই ভারত আজ তার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার যে সাড়ে সাত শতাংশ পার করতে চাইছে অর্থমন্ত্রীর প্রদত্ত সমীক্ষায় তা স্পষ্ট।প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি উচ্চাভিলাষী ভারতের জন্য। এই ভারতের যে যুব সম্প্রদায়ের আত্মনির্ভর হয়ে উঠার বিশ্বাস আর স্বপ্নে বুঁদ তাদের জন্য। আমি বিশ্বাস করি ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্রে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের নিজ দক্ষতার প্রমাণ রাখার সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় আশাবাদ, ইউরোপের ২৭ টি দেশের যে বিশাল বাজার আজ ভারতের সামনে খুলে গেছে সেই সব বাজারের প্রতিটি গ্রাহকের কাছে ভারতীয় পণ্য পৌছে দেওয়া যাবে তুলনায় কম দামে। তাই আজকের এই সময়ের দাবি হল, সমাধান তৈরি করা। কোনও বাধা তৈরি করা নয়। সমাধান- উন্মুখ একটি প্রশাসনকে এগিয়ে নিয়ে
যেতে তৈরি করা নয়।সমাধান উন্মুখ একটি প্রশাসনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সব সাংসদদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।এই কথা বিশ্বজনীন যে গত বছরের এপ্রিল মে থেকে আমেরিকার শুল্ক বাধার সামনে রুদ্ধ হয়ে যায় ভারতের রপ্তানি বাণিজ্য। উৎপাদন ক্ষেত্রে এক বিরতি এসে যায়। যা চলতি আর্থিক বছরে ভারতের আর্থিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আমেরিকার এই বাধা আজও কাটেনি। এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ইউরোপের বাজার ভারতের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয় ছিল। মুক্ত বাণিজ্যের এই প্রবাহ নিঃসন্দেহে ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্র, পরিষেবা ক্ষেত্রে এক সুপবন বয়ে আনবে।
দিল্লীত আর্থিক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে ভারতের আর্থিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬-২৭ সালে সাত দশমিক দুই শতাংএশ পৌছুবে। ২০২৫-২৬ সালের সমীক্ষা রিপোর্টেই অনুমান ছিল ছয় দশমিক তিন থেকে ছয় দশমিক আট। রিপোর্ট প্রকাশের পর দেশের অন্যতম অর্থনীতিবিদ, ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্তনাগেশ্বরম বলেছেন, আগামী কয়েক বৎসরের মধ্যে ভারতের আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে সাত শতাংশ ছাড়াতে পারে যদি দেশ তার উৎপাদন ক্ষেত্রে এবং রপ্তানি ক্ষেত্রে সংস্কার তেজি করতে পারে। এই কথা সত্য যে প্রধানমন্ত্রী মোদি যে বিকশিত ভারতের স্বপ্ন দেশের সামনে তুলে ধরছেন, তাকে ছুঁতে গেলে রপ্তানির ওপর জোর দিতেই হবে। বস্তুত আমেরিকার সঙ্গে রপ্তানি প্রত্যাশা থেকেই বিশ্বসেরা হওয়ার এক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একমাত্র আমেরিকার মুখাপেক্ষী হয়ে যে বিশ্বসেরা অর্থনীতির অভিলাশি হওয়া যায় না, সেই কথা শিখিয়ে গেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।বিশ্ব অর্থনীতি আজ যে অভিমুখ নিয়ছে তাতে ইউরোপের কোনও উন্নত দেশের পক্ষেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার সাত শতাংশ করে নেওয়া কঠিন। কারণ ভূ রাজনীতি ক্রমেই পাল্টাতে শুরু করেছে। ভারতের জন্য এই উপমহাদেশেও তাই-ই ঘটছে। ভারতীয় অর্থনীতির সামনে সেই ক্ষেত্রে বড় আঁচড় দিয়ে গেছে আমেরিকা। হয়তো তাই মুখ্য উপদেষ্টা ভি নাগেশ্বরন বললেন, ভূ রাজনীতি বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন আকার দিচ্ছে। আগামী দিনগুলিতে ভূ রাজনীতি সর্বত্রই বিনিয়োগ, যোগান শৃঙ্খল এবং প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে যাবে। এই অবস্থায় ভারতকে নিরন্তর নতুনতর অনুসন্ধানের পথে চলতে হবে। সেই পথই শুধু ভারতকে বিকশিত ভারতের দিকে নিয়ে যাবে।আর এই অনুসন্ধান আর প্রচেষ্টা যদি পরান্মুখতা আর এক পথের সামনে থেমে যায় তাহলে বারবার স্বল্পকালীন চাপের কাছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হবে।
Dainik Digital: