দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ১৩ ফেব্রুয়ারী: আওয়ামী লীগহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৬ ফেব্রুয়ারী নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৯৭আসনের মধ্যে ২০৯টি জিতে নিয়েছে বিএনপি। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা পাচ্ছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে। জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় নতুন শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হওয়া ধর্মভিত্তিক দলটি পেয়েছে ৬৮টি আসন। এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটে থাকা বিজেপি ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক এনসিপি তিনটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এদিন সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হয়। আর তাতে অনুমিতভাবেই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। এই ফলের অর্থ হলো, জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নের সম্মতি দিয়েছেন দেশের নাগরিকরা।
১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার সরকার গঠন করেছিল তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আর এবার তাদেরই সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি চতুর্থবারের মতো দেশ শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একানব্বইয়ের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল বিএনপি। তার পরের তিন নির্বাচনে দুইবার সরকার গঠন করলেও মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিল
একবার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে দলটি চলে গিয়েছিল শাসন ক্ষমতার বাইরে। আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি নির্বাচনের দুটি বর্জন করেছিল বিএনপি, একটিতে হয়েছিল ভরাডুবি। এরপর চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর নতুন বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সরকারে ফেরার পথ তৈরি হয়।
১৯ বছর পর বিএনপি যখন সরকারে ফিরছে, তখন নতুন মেরুকরণে বিরোধীর আসনে নেই তাদের ৩৫ বছরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা আর নিবন্ধন স্থগিত থাকায় সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশ শাসন করা আওয়ামী লীগের এবার ভোট করার সুযোগ ছিল না। প্রায় দেড় দশক টানা দেশ শাসন করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এখন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আর আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিয়েছেন। গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া যখন চিরবিদায় নেন, তার কয়েক সপ্তাহ আগে ঘোষিত হয়েছিল ত্রয়োদশ নির্বাচনের তফসিল।
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাচিত জীবন কাটিয়ে বিপুল সংবর্ধনায় দেশে ফিরে নির্বাচনি যাত্রায় নেমেছিলেন তারেক রহমান, যিনি মায়ের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। দেশ গঠনের ‘পরিকল্পনা’ নিয়ে দেশে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, এক্ষেত্রে দেশবাসীর সমর্থন তিনি চান। তার দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান তার মা, খালেদা জিয়া; নির্বাচনি আমেজের মধ্যে তার এই বিদায়ে নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেন তারেক। ভোটের সকালে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে এসে বিএনপির জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, আন্দোলনের সময়কার সঙ্গীদের পাশাপাশি ‘কম-বেশি’ আরও রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে তারা দেশ পরিচালনা করতে চান। আদালতের নির্দেশনার কারণে চট্টগ্রামের দুটি আসনের সংসদীয় ফল প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে ওই আসনগুলোতে গণভোটের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় গণভোটের ফল শতকরা হিসাবে যুক্ত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চার প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তারা সবাই বিএনপি-মনোনীত প্রার্থী। ঢাকা-৩ আসন থেকে জয় পেয়েছেন বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৭৮৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহীনুর ইসলাম পেয়েছেন ৮২ হাজার ২৩২ ভোট।
মাগুরা-২ আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপির নেতা নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি সম্পর্কে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বেয়াই। নিতাই রায় চৌধুরী ধামের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৬টি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ১৮ ভোট।
বান্দরবান থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেছেন সাচিং প্রু। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী পেয়েছেন ২৬ হাজার ১৬২ ভোট। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি বিএনপির মনোনয়নে ভোট করেছিলেন।
রাঙামাটি আসনে বিএনপির মনোনয়নে জয়লাভ করেছেন দীপেন দেওয়ান। তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৩১ হাজার ২২২ ভোট।
বিএনপি এবার ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ছয় ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন পরাজিত হয়েছেন। তারা হলেন বাগেরহাট-১ আসনের কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল ও বাগেরহাট-৪ আসনের সোমনাথ দে। এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি একজন করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী দিয়েছিল। তারা দুজনই পরাজিত হয়েছেন। তারা হলেন খুলনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী এবং মৌলভীবাজার-৪ আসনে এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৯ জন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২২টি দল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ৬৭ জনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ১২ জন প্রার্থী নির্বাচন করেন।
নির্বাচনি ফলাফলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীতে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘উল্লেখযোগ্য দিন’ হিসেবে অভিহিত করেন। শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নজরুল ইসলাম খান বলেন, এ দেশে গণতন্ত্রের পরীক্ষিত শক্তি বিএনপি। দলটির ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত হতে পেরেছি। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ও অভিযোগ সম্পর্কে নজরুল ইসলাম বলেন, জামায়াতের মনে কষ্ট আছে, তারা অভিযোগ করতেই পারে। আমাদের বিরুদ্ধে তারা কোনো অভিযোগ করেনি। ধারণা ছিল, আমাদের সব প্রার্থীই জিতবে। যাই হয়েছে, আগামী নির্বাচনে আমাদের ফলাফল আরও ভালো হবে।