ঋণের ফাঁদে এডিসি কর্মসংস্থান অটো প্রকল্পে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ২০ ফেব্রুয়ারী: জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অটো বিতরণ প্রকল্প চালু করেছে ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল। উদ্দেশ্য জনজাতি বেকার যুবকদের স্বনির্ভর করে তোলা এবং তাদের হাতে জীবিকার চাবিকাঠি তুলে দেওয়া। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখন এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি অটোর মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। এডিসি প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ৮০ হাজার টাকার ভর্তুকি। বাকি ২ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে একটি বেসরকারী ফিনান্স কোম্পানির মাধ্যমে যেখানে সুদের হার ধরা হয়েছে ১০.৬ শতাংশ। এই আর্থিক কাঠামো নিয়েই শুরু হয়েছে তীব্র প্রশ্ন ও সমালোচনা। অভিযোগ প্রকল্পটি বাস্তবে কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের ঋণের জালে আবদ্ধ করে ফেলছে। ১০.৬ শতাংশ সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিলে আসল টাকার সঙ্গে সুদের বোঝা মিলিয়ে প্রকৃত পরিশোধের অঙ্ক অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে একজন নতুন চালক যিনি সদ্য রাস্তায় নামছে তার পক্ষে মাসিক কিস্তি টানা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে। প্রশ্ন উঠছে কেন এডিসি প্রশাসন জাতীয়কৃত বা আঞ্চলিক ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা করল না। তাছাড়া ডিআইসির মাধ্যমে ব্যাঙ্ক ঋণ নিলে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি পাওয়ার সুযোগ ছিল। সেই হিসাবে প্রতি অটোর প্রায় ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৭৫০ টাকার ভর্তুকি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল জনজাতি যুবকদের। অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থায় ৮০ হাজার টাকার

পরিবর্তে প্রায় ৩৩ হাজার ৭৫০ টাকা বেশি ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বেনিফিসিয়ারিরা। শুধু তাই নয় ব্যাঙ্ক ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার তুলনামূলক কম এবং কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে কিছুটা মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়। অন্যদিকে, বেসরকারী ফিনান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে কিস্তি অনিয়মিত হলে গাড়ি বাজেয়াপ্ত করার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাছাড়া ব্যক্তিগত কারণে দুই বা তিনটি কিস্তি বকেয়া পড়লেই সংস্থা অটোটি নিজেদের দখলে নিয়ে নিতে পারে। এতে একদিকে যুবকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে অন্যদিকে সে ইতিমধ্যেই যে অর্থ পরিশোধ করেছে তার সিংহভাগই কার্যত হারিয়ে যাবে। এডিসিতে ১,২০০ জন জনজাতি যুবককে অটো দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ২০০ জনকে অটো প্রদান করা হয়েছে। এরপর প্রকল্প কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘তুঘলকি পরিকল্পনা’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। অভিযোগ পরিকল্পনার আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় না করে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।

ফলত লাভবান হয়েছে সংশ্লিষ্ট বেসরকারী ফিনান্স কোম্পানি, আর ঋণের ভার কাঁধে নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে ২০০ জন জনজাতি যুবক। কর্মসংস্থান প্রকল্প মানেই কেবল সম্পদ বিতরণ নয়, বরং টেকসই আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যদি শুরুতেই ঋণের কাঠামো বেনিফিসিয়ারির পক্ষে প্রতিকূল হয় তবে সেই প্রকল্পের সাফল্য প্রশ্নের মুখে পড়বেই। ব্যাঙ্কভিত্তিক স্বচ্ছ ব্যবস্থাকে এড়িয়ে বেসরকারী সংস্থার হাতে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া কেন? এই প্রশ্ন উঠেছে। জনজাতি যুবকদের

প্রকৃত আর্থিক স্বার্থের চেয়ে দ্রুত প্রকল্প প্রদর্শনের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অটো প্রকল্পের নামে আর্থিক ঝুঁকি চাপিয়ে দেওয়া কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বনিযুক্তি প্রকল্পে প্রথম পাঁচ বছর সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়। আয় অনিশ্চিত থাকে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

এই প্রেক্ষাপটে উচ্চ সুদের ঋণ নতুন উদ্যোক্তাকে শুরুতেই বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। সত্যিই জনজাতি যুবকদের ক্ষমতায়ন লক্ষ্য হয় তবে ব্যাঙ্ক-ভিত্তিক স্বল্প সুদের ঋণ, অধিক ভর্তুকি এবং প্রশিক্ষণ – সহায়তার সমন্বিত প্যাকেজ প্রয়োজন ছিল। ইতিমধ্যে অটো প্রাপ্ত ২০০ যুবকের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য কি কোনো বিকল্প সহায়তা ঘোষণা করা হবে? কারণ কর্মসংস্থানের স্বপ্ন যদি ঋণের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় তবে তার দায় এড়ানো যায় না।স্বনির্ভরতার নামে যদি আর্থিক অনিশ্চয়তার ফাঁদ পাতা হয় তবে সেই প্রকল্পের সাফল্য কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাস্তবের রাস্তায় তখন চলবে শুধু ঋণের বোঝা বয়ে বেড়ানো অটো আর চালকের চোখে থাকবে অনিশ্চিত আগামী দিনের আতঙ্ক।

Dainik Digital: