দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ২৮ ফেব্রুয়ারী: আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে সত্তরের বেশি মানুষ মারা গেছেন শনিবার সকালে। ইরানের অজস্র সামরিক কাঠামোয় বিমান হামলা চলে। মেয়েদের একটি স্কুলে ইজরায়েলি বোমা হামলায় শিক্ষার্থী মৃত্যুর সংখ্যা ৫১-এর বেশি। অনুমান করা হচ্ছে আমেরিকা, ইরানের হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদহ এবং রেভলুশনারি গার্ডের কমান্ডার মোহম্মদ পাকপুর মারা গেছেন। তবে এই সংবাদে এখনো সিলমোহর দেয়নি ইরান। সকালে হামলার পর দিন গড়াতেই পাল্টা হামলায় নামে ইরান। উপসাগরীর বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নেয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে যুদ্ধ উপসাগরীয় সব ক’টি দেশেই ছড়িয়ে না পড়ে।
সন্ধ্যায় ইরানের তরফে জানানো হয়েছে, দেশের ৩২টি প্রদেশের মধ্যে ২০টিতেই হামলা চলেছে। নাগরিকদের প্রতি সাবধানতা, সতর্কতা জানিয়ে তেহরানের এক কোটি বাসিন্দাকে স্থান ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলির দিকে এখন তেহরানবাসীর স্রোত। সেনাবাহিনী রাজধানী খালি করার অভিযানে যানজট সামলাচ্ছে।
ইরানের সংবাদ সংস্থা ইরনার খবর, সকালে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে মেয়েদের একটি স্কুলে ইজরায়েলি হামলায় ৫১ ছাত্রী মারা গেছে। আহতের সংখ্যা ৬০। স্থানীয় কর্মকর্তার আশঙ্কা হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সে সময়ে স্কুলে ১৭০ জন শিক্ষার্থী হাজির ছিল। প্রসঙ্গত, এই হামলার সময়ে ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে অজস্র স্থানে বোমা ফেলে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ যুদ্ধবাহিনী। বিশেষত ইরানের শতাধিক প্রতিরক্ষাস্থলে হামলা হয়। সময় এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে ইরান পাল্টা হামলা চালায়। কাতার, বাহরাইন সহ ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলিতে যেখানে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে সেখান থেকে বোমা বিস্ফোরণের খবর জানাচ্ছে সংবাদ সংস্থা। ইজরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বিশেষ করে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে শত শত সামরিক অবস্থানে তারা হামলা করেছে। ইজরায়েলের সামরিক বাহিনী ইরানের পাল্টা হামলা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ইরানের উপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। রুশ বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ইরানের বিদেশমন্ত্রী আবুাস আরগাচির সঙ্গে টেলিফোন আলাপচারিতায় এই হামলার বিপক্ষে রুশ অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন। রাশিয়া এই হামলার ঘটনাকে ‘বিনা প্ররোচনায় হামলা’ বলে মন্তব্য করে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ আমেরিকা
ও ইজরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে এতে ‘তথাকথিত পদক্ষেপ’ বলে হামলার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বলেছেন উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরও অনিশ্চিত ও প্রতিকূল অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বব্যবস্থাকে। সানচেজ ইরান সরকার ও রেভলুশনারি গার্ড-এর কাজকর্মের সমালোচনা করেই দুই দেশের আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তার সামাজিক প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘আমরা অবিলম্বে উত্তেজনা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সশ্রদ্ধ থাকার দাবি জানাই।’
খবর আসছে উপসাগরের দেশ আমিরাত, কাতার, জর্ডন এবং কুয়েতের আমেরিকা সেনা ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলা ও প্রতিহত করার দাবি জানিয়েছে আমিরাতের প্রতিরক্ষা বাহিনী। একই দৃশ্য কাতারে। আকাশে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জোর দৃশ্য দেখছেন দেশের মানুষ। আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র সংঘর্ষের ফলে ধ্বংসাবশেষ নেমে আসছে আবাসিক এলাকায়। দোহার উপকণ্ঠে একটি আবাসিক এলাকা থেকে ধোঁয়া উদগীরণের সংবাদ জানানো হয়েছে। এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় আমেরিকার সামরিক কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ব্যাপক হামলা অব্যাহত থাকবে জলপথে এবং আকাশপথে। এই মুহূর্তে হামলা শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ আছে। এই হামলাগুলি ইজরায়েলি সেনার সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা কবে করা হচ্ছে।
শনিবার বিকালে ইজরায়েলের সেনাবাহিনী দেশের জনগণকে যুদ্ধ সতর্কতায় বলেছে, ‘প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র নয়। তাই সবাইকে নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। সেনা বিবৃতিতে জানানো হয়, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন ঢেউ প্রতিহত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে ইজরায়েলি বাহিনী। ইরান থেকে ইজরায়েলের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার পর কয়েকটি এলাকায় সাইরেন বাজানো হয়েছে। ইজরায়েলি বিমান ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষমতার সঙ্গে কাজ করছে। তবে সবাইকে সেনাবাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এদিকে উপসাগরের বিভিন্ন দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। বাহরাইন, কাতার, জর্ডন ও কুয়েতে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে রিয়াদ বলেছে, এই হামলা দেশগুলির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। সার্বভৌমত্বে লঙ্ঘন চলতে থাকলে এর ‘পরিণতি গুরুতর’ হতে পারে। প্রসঙ্গত, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিনি ঘাঁটিগুলি লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ঘটনার পর থেকেই ইরানের পক্ষ নিয়ে রাশিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আমেরিকা-ইজরায়েল জুটির সমালোচনা করে আসছে। ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে রুশ নিরাপত্তা কাউন্সিলের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, শান্তির দূত আরও একবার নিজের আসল চেহারা দেখিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে যত আলোচনা সবই ছিল অভিযান আড়াল করার কৌশল। এনিয়ে কারও কোনো সংশয় নেই। কেউ সত্যিকার অর্থে কোনও কিছুতে একমত হতে চায়নি। প্রতিবেদন লেখা অবধি ইরান উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশগুলিতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। সৌদি আরবের বিবৃতির পরপরই ইরান জানিয়ে দিয়েছে- ইজরায়েল ও আমেরিকার ঘাঁটিগুলি লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়ে যাবে। ইসলামিক রেভলুশনারি গার্ড কোর-এর হুঁশিয়ারি সম্পর্কে সংবাদ সংস্থা আল জাজিরা বলেছে, ইজরায়েলে হামলা চালিয়ে যাওয়া হবে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে যে সব মার্কিন ঘাঁটি ও আস্তানা রয়েছে সেগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চলবে।
এদিকে ঘরের ভেতরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলা চালিয়ে যথারীতি সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছেন। সংবাদ সংস্থাকে ডেকে শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি একটি নিরাপদ জাতি চাই, সেটাই আমরা পেতে চলেছি। আমি শুধু জনগণের স্বাধীনতা চাই।’ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন জানিয়েও তা দেননি। এদিকে আমেরিকার সিনেটর এডোয়াগে জে মার্কি ইরানে হামলার ঘটনাকে অসাংবিধানিক এবং কংগ্রেসের অনুমোদিত নয় বলে জানিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু ক্ষেত্রকে অতিরঞ্জিত করে এই আগেও ‘অপারেশন মিডনাইট’ করেছিলেন এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বিধ্বস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। আবার বলেই চলেছেন, ইরানের হুমকি আসন্ন!