আওয়ামী ভোট

সম্পাদকীয়, ১৪ ফেব্রুয়ারী: বাংলাদেশে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পরও সবাই বিশ্বাস বাংলাদেশোরে করতে পারেননি যে বাংলাদেশে নির্বাচন হবে আর আওয়ামী লীগ থাকবে না। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের যে জনভিত্তি এবং জনসমর্থন তা আগস্ট মাসের বিপ্লবোত্তর এই দেড় বছরেও কিছুমাত্র ক্ষয় হয়নি। এটি বুঝা যাচ্ছে ভোট বিশ্লেষণে। একটি দল ভোটে না থেকেও থেকেই গেল ফলাফলে। জয়ে এবং পরাজয়ে। যদিও আওয়ামী লীগের ভোটারদের অনেকেই ভোট দিতে যাননি কিংবা যাওয়া দরকার মনে করেননি। হয়তো চিরশত্রু ‘ধানের শীষে’ ভোট দিতে হাত কাঁপবে কিংবা জীবনে ‘নৌকা’ ছাড়া আর কোনো প্রতীকে ভোট না দেওয়ার ওয়াদা তাদের ছিল।

সর্বোপরি দিল্লীর আস্তানায় আশ্রিত নেত্রীর কোনো প্রকাশ্য নির্দেশ তো তাদের কাছে যায়নি। এর পরেও আওয়ামী লীগই ২০২৬ এর সংসদ নির্বাচনের ফলাফল যে নির্ধারণ করে দিলো তাতে সন্দেহ নেই অধিকাংশ বিশ্লেষকের।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের পর যতগুলি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের পনেরো ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন বাদ দিলে সব নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছে। কখনো জয়ী হয়ে সরকার গড়েছে কখনো পরাস্ত হয়ে বিরোধী আসনে বসেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনা করেছে। এই নির্বাচনগুলিতে তারা ত্রিশ শতাংশ থেকে সাতচল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। আওয়ামী লীগের একটানা পনেরো বছরের শাসন এবং ওই সময়ে তিন তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনার কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল বটে কিন্তু সংগঠনে ধস নামেনি। এমনকী আগস্ট অভ্যুত্থানের পর, শেখ হাসিনার দেশ-ত্যাগের পর এমনকী ইউনুস সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার পরও তাদের সংগঠন অটুট ছিল।

তা মানতেন বিএনপি এবং জামায়াতের নেতারা। ফলে ভোটের প্রচারে নেমে তারা আওয়ামী ভোটারদের ভজনা করেছেন। তাদের মন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বীরা জানতেন, আওয়ামী লীগের যে বিশাল ভোটব্যাঙ্ক তার অর্ধেকও যদি ভোট দিতে যান তাহলেই প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়ে যায়। বাস্তবে হলোও তাই। আওয়ামীর সব ভোটার ভোটকেন্দ্রে গেলে ভোটদানের হার হয়তো আশি শতাংশ ছুঁয়ে যেতো-যা বাংলাদেশে অতীতে প্রায়ই দেখা গেছে। তা হয়নি, ভোটদান ষাট শতাংশের ঘর পার করেনি। যারা ভোট দিতে গেছেন তারা ইসলামি দল, জামাতের প্রার্থী বা এনসিপি প্রার্থীদের বিপক্ষেই ভোট দিয়েছেন। এক কথায় ইসলামি জোটকেই বড় শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছেন তারা ফলাফলে এ বিষয়টি স্পষ্ট।

জানুয়ারীর শেষদিকেই বুঝা গিয়েছিল দলনেত্রী শেখ হাসিনার তরফে কোনো নির্দেশ বা উপদেশ না এলেও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা দলের ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। স্থানীয় বিবেচনায় যাঁকে ভোট দিলে সুবিধা হবে সেই দলকেই ভোট দিতে বলা হচ্ছে দলীয়ভাবে। ভোট যত এগিয়ে এসেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক সভা সমিতিতে ততই বেশি বেশি করে দেখা গেছে। তারা বিএনপির ঘরোয়া সভা বা পাড়ার সভায় হাজির থেকে বিএনপি প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য বলেছেন। নিজেদের ভোটারদের বুঝিয়েছেন, ইসলামি জোট নয়, বিএনপি সরকারে এলে আগামীদিনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরতে সুবিধা হবে। এমনও দেখা গেছে, বিএনপির সভায় দাঁড়িয়ে বিএনপি প্রার্থীকে জয়ী করার আবেদন রেখে আওয়ামীর স্থানীয় নেতা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছেন সে সব খবর সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ হচ্ছে।

অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার ভাষণেই জানিয়েছিলেন, ‘এবার তো নৌকা নেই। নৌকা পালিয়েছে। মাঝখানে তাদের সমর্থকদের বিপদে ফেলে গেছেন। আমরা সেই বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। জামায়াতের নেতা আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মহম্মদ তাহের কুমিল্লার চৌদ্দ গ্রামে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আমি নিলাম। আপনাদের একজনেরও কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এক কথায় বাংলাদেশের এই ভোটে না থেকেও কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকেই গেলো আওয়ামী লীগ।

Dainik Digital: