অস্তিত্বের অপলাপ

অস্তিত্ব কেবল নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সমাহার নয়, নাগরিকের পরিচয় তার অধিকারে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিতে আজ এক অদ্ভুত জাদুকরী শুরু হয়েছে, যেখানে কলমের এক আঁচড়ে জীবন্ত মানুষ 'মৃত' হয়ে যায়, আর ঘরের পাশের প্রতিবেশী রাতারাতি হয়ে পড়ে 'বিদেশি'। আসামের সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যে মহাযজ্ঞ চলছে, তা আসলে নাগরিকের অধিকার রক্ষা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নিধনযজ্ঞ। যেখানে সেলিম আহমেদ বা নুরুদ্দিন আহমেদের মতো মানুষেরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের এবং পরিবারের নাম কাটার আবেদন জমা দেন, সেখানে বুঝতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক গভীর ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। জালিয়াতি যখন শাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের মুখচ্ছবিটি হয়ে পড়ে মলিন ও বিকৃত।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজনীতির দাবার বোর্ডে যে চালটি দিয়েছেন, তা যেমন দুঃসাহসিক তেমনই নিষ্ঠুর। প্রায় ত্রিশ লক্ষ ভোটারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমিয়ে তিনি আসলে এক ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম করতে চেয়েছেন। বিরোধিদের কণ্ঠস্বর যখন 'ভূমিপুত্র-বিরোধীতা'র ভয়ে ক্ষীণ হয়ে আসে, তখন শাসকের অনমনীয় আস্ফালন আরও তীব্র হয়। সাত নম্বর ফর্মের গণ-অপব্যবহার আজ আসামের প্রান্তিক মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা অভিযোগকারী, তারা শুনানিতে অনুপস্থিত; অথচ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকে সশরীরে হাজির হয়ে নিজের 'জীবিত' থাকা কিংবা 'নাগরিকত্ব' প্রমাণ করতে হচ্ছে। এই যে প্রমাণের দায়ভার উল্টে দেওয়া, এ তো কেবল আইনি বিচ্যুতি নয়, এ হলো এক সামাজিক নিগ্রহ। শাসকদলের মণ্ডল সভাপতির ফাঁকা ফর্মে সই করিয়ে রাখা কিংবা মৃত বলে নোটিশ পাঠানো কি নিছকই প্রশাসনিক ত্রুটি? না কি এক সুচিন্তিত রণকৌশল, যার লক্ষ্য নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়া?সবচেয়ে ভয়াবহ হলো এই কারচুপির পর মুখ্যমন্ত্রীর দর্পিত ঘোষণা। যখন তিনি সদর্পে বলেন, 'মিয়া ভোটারদের কষ্ট দেওয়াই আমার কাজ" তখন সংবিধানের শপথ আর রাজনীতির শালীনতা- দুই-ই রসাতলে যায়। একদা যে আসাম 'শংকর- আজানের দেশ' হিসাবে পরিচিত ছিল, সেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের ঐতিহ্যকে আজ স্রেফ গায়ের জোরে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। ইতিহাস বই থেকে বাঘ হাজরিকার নাম মুছে ফেলে কিংবা অজানা পিরের অবদানকে অস্বীকার করা আসলে আসামের আত্মপরিচয়কেই খণ্ডবিখণ্ড করা। সরাইঘাটের যুদ্ধ কি তবে কেবল একটি পক্ষের শৌর্য ছিল? ইতিহাসকে নতুন করে লেখার নামে যে সংকীর্ণতা আজ প্রদর্শিত হচ্ছে তা আগামী প্রজন্মের কাছে বিকৃত সত্য পরিবেশন করার আয়োজন মাত্র।আসলে,এই লড়াই কেবল ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না-থাকার নয়। এ হলো স্মৃতি বনাম বিস্মৃতির লড়াই। যেখানে রাষ্ট্র নিজেই ডাকাত সেজে নাগরিকের পরিচয় লুন্ঠন করতে নামে, সেখানেই আইনের শাসন কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। উচ্চ আদালত জবাব চেয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে হীনম্মন্যতা ও ঘৃণা সমাজদেহে ইনজেকশননের মতো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, এর প্রতিকার কোথায়? যেখানে বীরেরা ইতিহাস থেকে নির্বাসিত হন, সেখানে সাধারণ সেলিম বা নুরুদ্দিন রা যে বেঁচে থেকেও 'মৃত' হিসেবে সরকারী খাতায় নথিভুক্ত হবেন- সে আর এমন কী বড় কথা! আসাম আজ এক অন্ধকার বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়নের স্লোগান ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্রান্তিক মানুষের আর্তনাদ আর শাসকের নিষ্ঠুর অট্টহাসিতে।
আসলে, এই প্রবল প্রতাপের তলায় যে শাণিত রাজনীতি কাজ করছে, এর লক্ষ্য কেবল ভোটের অঙ্ক নয়, বরং মানুষের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করা। প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্র নিজেই জালিয়াতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নাগরিকের পরিচয় হরণ করতে প্রলুব্ধ হয়, সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিটি ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে? ক্ষমতা যখন সদর্পে ঘোষণা করে যে বিশেষ একটি সম্প্রদায়কে কষ্ট দেওয়াই তার ঘোষিত অভীষ্ট, তখন কি আর সংবিধানের দোহাই পাড়া সাজে? আজান পিরের সুফিবাদী গান কিংবা বাঘ হাজরিকার বীরগাথা মুছে ফেলার এই যে উগ্র বাসনা, তা কি আদতে অসমের শাশ্বত সমন্বয়ের ইতিহাসকেই অস্বীকার করা নয়? ইতিহাস যখন শাসকের কলমে কাটছাঁট হয়, তখন সত্য গৌণ হয়ে পড়ে, মুখ্য হয়ে ওঠে দম্ভ। সম্ভবত আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র এটাই চায়: নাগরিক নয়, পড়ে থাকুক কেবল কিছু আজ্ঞাবহ ছায়া।অস্তিত্বের এই অপলাপ রুখতে না পারলে,গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকাটি হয়তো ব্রহ্মপুত্রের জলেই চিরতরে নিমজ্জিত হবে।
Dainik Digital: