অভিনেতার মৃত্যু ও কিছু প্রশ্ন

এক অভিনেতার মৃত্যু অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল।সম্প্রতি বাংলা টেলি সিরিয়ালের এক অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে দীঘার কাছে ওড়িশার তালসারীতে।সমুদ্রে শুটিং চলাকালীন জলে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে গাফিলতির। এর জেরে এবার টলিপাড়া একত্রিত হয়ে আন্দোলনে নেমেছে। আপাতত সমস্ত অভিনেতারা এবং টেকনিশিয়ানরা কর্মবিরতি শুরু করেছেন। ফলে আপাতত টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে সমস্ত ধরনের শুটিং বন্ধ রয়েছে। শিল্পী-কলাকুশলীদের দাবি, আগে তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। এরপর তারা কাজে যোগ দেবেন। যদিও এই কর্মবিরতি তুলে নেওয়া হয়েছে। এর আগে আসামের তথা দেশের বিখ্যাত গায়ক জুবিন গর্গের মৃত্যুও সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। জুবিন গর্গেরও মৃত্যু হয়েছিল সিঙ্গাপুরে জলে ডুবে। তার মৃত্যু নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। সেই জুবিন গর্গ এবার আসামের বিধানসভা নির্বাচনেও অন্যতম এক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাকতালীয়ভাবে জুবিন গর্গ তার একটি হিট গান গিয়েছিলেন এই সদ্যপ্রয়াত রাহুলের গলায়। রাহুলেরও সম্প্রতি একই পরিণতি হওয়ায় এবার রাহুলের মৃত্যু নিয়েও মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে এবং একই সঙ্গে তদন্তের দাবি উঠেছে। এই ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবিও করেছেন শিল্পী ও কলাকুশলীরা। এবার টলিউডে আন্দোলন শুরু হয়েছে রাহুলের মৃত্যুকে ঘিরে।

রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় যদি একজন সাধারণ মানুষ হতেন, তাহলে তার এই মৃত্যু নিয়ে এত হইচই হতো না। তিনি একজন অভিনেতা।তার হাজার হাজার অনুগামী রয়েছে। তাকে হাজার হাজার মানুষ ভালোবাসেন। সুতরাং তার এই আকস্মিক এবং অকাল মৃত্যু কেউই
মেনে নিতে পারছেন না।

সিনেমায় এবং সিরিয়ালে অভিনয় করার সময় অনেক সময়ই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নানা দুর্ঘটনার মুখে পড়েন। সব সময় যে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়, এমনটা নয়। বর্তমান সময়ে সিনেমা কিংবা সিরিয়ালে কাজ করার ক্ষেত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নানা রকম মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পরিচালক-প্রযোজকদের নানা নির্যাতন-পাশবিকতার শিকারও তাদের অনেক সময় হতে হয়। কারণ বর্তমান সময়ে সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা এরকম পর্যায়ে চলে গেছে যে, যেকোনো মুহূর্তে কাজ হারানোর ভয় সবার মধ্যে কাজ করে। ফলে সবার পক্ষে সব সময় প্রতিবাদমুখর হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর ফলে পরিচালক-প্রযোজকরা বেশিরভাগ সময়ই মনোপলি চালাতে থাকেন।এটা ঘটনা।

অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বাংলা টিভি সিরিয়ালের শুটিংয়ের জন্য ওড়িশার তালসারীতে গিয়েছিলেন। সমুদ্রে শুটিং হবে, এর জন্য কোনো ধরনের আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বা নিরাপত্তার কোনো আগাম ব্যবস্থা ছিল না। ফলে সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে শুটিং – চলাকালীন আচমকাই জলে ডুবে যান রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তার সহ-অভিনেত্রী অবশ্য বরাত জোরে এই যাত্রায় বেঁচে যান। রাহুল মারা গিয়ে এবার টলিউডের শিল্পী-কলাকুশলীদের এক করে দিয়ে গেলেন। তার মৃত্যুর পর টলিউডের শিল্পীরা যেন জেগে উঠলেন। আর্টিস্ট ফোরাম এবং ফেডারেশনের প্রায় ১১ হাজার সদস্য-সদস্যা একজোট হয়ে এবার কর্মবিরতিতে নামলেন। তাদের দাবি, আগে অভিনয়ের সময় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। আপাতত অনির্দিষ্টকালের জন্য এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। এর আগে কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রীর মৃত্যুতে এ ধরনের আন্দোলন দেখা যায়নি। টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা।

টলিউড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষের যোগাযোগ। শিল্পী-কলাকুশলীরা এই ৩০-৪০ লক্ষ মানুষের সুষ্ঠু নিরাপত্তা চাইছেন। এক সময়ে টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে ছোট ছোট বাজেটের সিনেমা হতো। টলিউড ইন্ডাস্ট্রির এক সোনালি গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। নায়ক-নায়িকা থেকে গায়ক-গায়িকা, এক সময় বাংলা সিনেমা কাঁপিয়েছে। হালে-সিনেমার নায়ক-নায়িকারা টেলি সিরিয়ালের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। সদ্যপ্রয়াত রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ও এক সময় সিনেমা করতেন। বর্তমানে তিনি টিভি সিরিয়ালের জনপ্রিয় এক অভিনেতা। সেই অভিনেতার অকাল এবং আকস্মিক মৃত্যু টলিউডে যেমন এক শূন্যতা নিয়ে এসেছে, তেমনি অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে তার মৃত্যু। টলিপাড়ার এ আন্দোলন দেখা যাক পরিচালক-প্রযোজকদের টনক নাড়াতে পারে কি না। পরিচালক-প্রযোজকদের ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা যাতে আর না হয়, সেজন্য আরও সাবধানী হতে হবে।টলিপাড়ার শিল্পী-কলাকুশলীরা তাদের এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের শিল্পী-অভিনেতাদের সামনে কোনো দৃষ্টান্ত রেখে যেতে পারেন কি না,তাই এখন দেখার বিষয়।

Dainik Digital: